Summary
জনপদের তথ্য:
প্রাচীন বাংলায় বিভিন্ন ছোট ছোট অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল জনপদ, যা স্থানীয় শাসকদের দ্বারা শাসিত হত। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জনপদের বর্ণনা দেওয়া হলো:
- পৌড়: সাতম শতকে গৌড় রাজ্যের অংশ ছিল। রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ, যা বর্তমান মুর্শিদাবাদের অংশ।
- বঙ্গ: এটি একটি প্রাচীন জনপদ যেখানে 'বঙ্গ' জাতি বাস করত। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দুটি অঞ্চল উল্লেখ আছে: বিক্রমপুর এবং নাব্য।
- পুণ্ড্র: বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকায় অবস্থিত। এর রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর, বর্তমানে মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ।
- হরিকেল: আধুনিক সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জনপদ।
- সমতট: পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় অবস্থিত, এটি কুমিল্লার প্রাচীন নাম হতে পারে।
- বরেন্দ্র: পুন্ড্রের একটি অংশ, বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলায় বিস্তৃত।
- তাম্রলিপ্ত: মেদিনীপুর জেলার তমলুককে কেন্দ্র করে গঠিত।
- চন্দ্রদ্বীপ: বরিশাল জেলার মূল ভূখণ্ড এবং এটি বালেশ্বর ও মেঘনার মধ্যবর্তী স্থানে ছিল।
প্রাচীন বাংলার এই জনপদগুলি থেকে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য এবং ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তখন রাজনৈতিক ঐক্য না থাকায় বিভিন্ন শক্তিশালী শাসক নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতেন।
জনপদ:
প্রাচীন যুগে বাংলা বৰ্তমান বাংলাদেশের মতো একক ও অখণ্ড ছিল না। সাম্রাজ্যভিত্তিক বা কেন্দ্রীয় শাসন শুরু হওয়ার আগে বাংলা ছোট ছোট অনেকগুলো অঞ্চলে বিভক্ত ও স্থানীয়ভাবে শাসিত হতো। প্রাচীন বাংলার জনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর এই ছোট ছোট অঞ্চলগুলোকেই বলা হয় জনপদ।
নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জনপদের বর্ণনা দেওয়া হলো :
পৌড়: 'গৌড়' নামটি সুপরিচিত হলেও প্রাচীনকালে ঠিক কোথায় পৌড় জনপদটি গড়ে উঠেছিল তা জানা যায়নি। তবে ষষ্ঠ শতকে পূর্ব বাংলার উত্তর অংশে গৌড় রাজ্য বলে একটি স্বাধীন রাজ্যের কথা জানা যায়। সপ্তম শতকে শশাঙ্ককে গৌড়রাজ বলা হতো। এ সময় পৌড়ের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায় ছিল এর অবস্থান। বাংলায় মুসলমানদের বিজয়ের কিছু আগে মালদহ জেলার লক্ষণাবতীকেও গৌড় বলা হতো।
বঙ্গ : 'বঙ্গ' একটি অতি প্রাচীন জনপদ। বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বঙ্গ জনপদ নামে একটি অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। অনুমান করা হয়, এখানে 'বঙ্গ' বলে একটি জাতি বাস করতো। তাই জনপদটি পরিচিত হয় 'বঙ্গ' নামে। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দুইটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়- একটি 'বিক্রমপুর', আর অন্যটি 'নাব্য' । বর্তমানে না বলে কোনো জায়গার অস্তিত্ব নেই। ধারণা করা হয়, ফরিদপুর, বাখেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর নিচু জলাভূমি এ নাব্য অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত ছিল। প্রাচীন বঙ্গ জনপদ ছিল খুব শক্তিশালী অঞ্চল। 'বঙ্গ' থেকে 'বাঙালি জাতির উৎপত্তি ঘটেছিল।
পুণ্ড্র : প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুণ্ড্র। বলা হয় যে, পুণ্ড্র বলে একটি জাতি এ জনপদ গড়ে তুলেছিল। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চল নিয়ে এ পুণ্ড্র জনপদটির সৃষ্টি হয়েছিল। পুণ্ড্রদের রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে পুত্রই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ জনপদ। পাথরের চাকতিতে খোদাই করা লিপি এখানে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রাপ্ত এটিই প্রাচীনতম শিলালিপি ।
হরিকেল : সপ্তম শতকের লেখকরা হরিকেল নামে অপর একটি জনপদের বর্ণনা করেছেন। এ জনপদের অবস্থান ছিল বাংলার পূর্ব প্রান্তে । মনে করা হয়, আধুনিক সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই জনপদ বিস্তৃত ছিল। সমতট : পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বঙ্গের প্রতিবেশী জনপদ হিসেবে সমতটের অবস্থান। কেউ কেউ মনে করেন, সমতট বর্তমান কুমিল্লার প্রাচীন নাম। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে শুরু করে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রকূলবর্তী অঞ্চলকেই সম্ভবত বলা হতো সমতট। কুমিল্লা শহরের ১২ মাইল পশ্চিমে বড় কামতা এর রাজধানী ছিল। কুমিল্লার ময়নামতিতে কয়েকটি প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে। শালবন বিহার এদের অন্যতম ।
বরেন্দ্র : বরেন্দ্রী, বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রভূমি নামে প্রাচীন বাংলায় অপর একটি জনপদের কথা জানা যায়। এটিও উত্তরবঙ্গের একটি জনপদ। অনুমান করা হয়, পুন্ড্রের একটি অংশ জুড়ে বরেন্দ্রর অবস্থান ছিল। বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলার অনেক অঞ্চল এবং সম্ভবত পাবনা জেলাজুড়ে বরেন্দ্র অঞ্চল বিস্তৃত ছিল ।
তাম্রলিপ্ত : হরিকেলের দক্ষিণে অবস্থিত ছিল তাম্রলিপ্ত জনপদ। বর্তমান মেদিনীপুর জেলার তমলুকই ছিল তাম্রলিপ্তের প্রাণকেন্দ্র। সপ্তম শতক থেকে এটি দণ্ডভুক্তি নামে পরিচিত হতে থাকে।
চন্দ্রদ্বীপ : প্রাচীন বাংলায় আরও একটি ক্ষুদ্র জনপদের নাম পাওয়া যায়। এটি হলো চন্দ্রদ্বীপ। বর্তমান বরিশাল জেলাই ছিল চন্দ্রদ্বীপের মূল ভূখণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র। এ প্রাচীন জনপদটি বালেশ্বর ও মেঘনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল।
প্রাচীন বাংলার জনপদ থেকে আমরা তখনকার বাংলার ভৌগোলিক অবয়ব, সীমারেখা, রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করতে পারি। প্রাচীন বাংলায় তখন কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। শক্তিশালী শাসকগণ তাদের আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে একাধিক জনপদের শাসন ক্ষমতা লাভ করতেন।
Read more